গৌতম চন্দ্র বর্মন, ঠাকুরগাঁও : পশ্চিমা সংস্কৃতির করাল গ্রাসে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী 'বিয়ের গীত'। বিয়ে বাড়িতে লোকজ গানের বদলে এখন বাজানো হয় আধুনিক নামধারী পাশ্চাত্য ঢংয়ের অনুকরণীয় দেশী বিদেশী গান। শত শত বছরের বাংলার রূপ, লাবণ্য, বৈশিষ্ট্য কালক্রমে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। হাজার বছরের লালিত বাংলার জীবনযাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্র বদলে যাচ্ছে।
বাঙালি সংস্কৃতিতে লোকসঙ্গীতের যে কয়েকটি ধারা ক্রমান্বয়ে লোকসংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে তার মধ্যে 'বিয়ের গীত' অন্যতম। প্রচলিত এবং তাৎক্ষণিকভাবেও রচিত এই গানগুলি লোকসংস্কৃতির এক অমূল্য ভাণ্ডার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
দেশের ও পশ্চিম বঙ্গের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে এখনও 'বিয়ের গীত' এর প্রচলন রয়েছে। তবে কালক্রমে বিলুপ্তির পথে গ্রাম-বাংলার এই ঐতিহ্য 'বিয়ের গীত'।
ঠাকুরগাঁও জেলার বিশ্রামপুর গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে এখনো বিয়ে বাড়িতে বিয়ে বাড়ির গীতের এর প্রচলন রয়েছে। নারী, বৃদ্ধসহ সবাই মিলে একসাথে দলবদ্ধ হয়ে বিয়ের একদিন দুইদিন আগে গীত গাওয়া শুরু করেন।
মেয়ের পক্ষ থেকে মেয়েকে বিদায় দেওয়া পর্যন্ত মেয়ের বাড়িতে গীত গাওয়ানো চলে। পাত্র পক্ষের বাড়িতে গায়ে হলুদ থেকে শুরু করে পরের দিন বৌভাত পর্যন্ত বিয়ের গীত চলে।
পাত্রের বাড়িতে পাত্রীকে নিয়ে আসার পরের দিন ছেলে, মেয়ে, বৃদ্ধ, নারীসহ অনেকে বিয়ের গীত ও রং-মাখা, কালি-মাখা সহ নাচ-গান করে আনন্দে মেতে ওঠেন। এইসব গ্রামীণ ঐতিহ্য এক সময়কার জনপ্রিয় 'বিয়ের গীত' এখন বিলুপ্তির পথে।
বিয়ের দিনে বর আসার আগে থেকে শুরু হয় এই গান। বিয়ের নানা পর্যায়ের জন্য নানা ধরনের 'গীত' ভাগ করা আছে। আর গানের প্রতিপাদ্য বিষয়ে আছে বিয়েকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পক্ষ থেকে নানা কথাবার্তার উল্লেখ। যেমন বর আসার আগে প্রতিবেশীরা বলছে – "দুলহন সাজাও আম্মা খুবসুরত করিয়া/ দামান আসিছে দেখি পাগড়ি নাড়িয়া।" মা আবার প্রতিবেশীদের উত্তর দিচ্ছেন গীতের মধ্যেই – "আসুক নারে পুতার দামান, চিন্তার নাই কিছু/ কামরঙা রঙ পাটি পিঁধে বেটি যাবে পিছু পিছু।" বর এসে পৌঁছালে, বর দেখে এসে বাড়ির মেয়েমহলে বরের রূপ বর্ণনা করার রেওয়াজও খুব জনপ্রিয় ছিল মুসলিম গীতের মধ্যে – "কোথায় গিলা পুতের মা/ দামান দেখো আইয়া/ রূপের বান ডাইকা দিল/ কত মিস্টি লইয়া।"
আধুনিকতা নামক অপসংস্কৃতির কারণে এইসব 'বিয়ের গীত' ও বর কনে খেলা এখন আর চোখে না পড়ার মতো। বিভিন্ন কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের অনুষ্ঠানে মানুষ এখন গ্রামীণ প্রচলন কে ভুলে যাচ্ছে, ভুলে যাচ্ছে গ্রামীণ শিকড়। এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম অঞ্চলের বিয়ের গীত। তবে ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় দিনাজপুর সহ কিছু কিছু জেলা বা এলাকায় এখনো প্রচলন রয়েছে বিয়ের গীত ও বর কনে খেলা।
পঞ্চগড় জেলার আটোয়ারী থানার রসেয়া জামুরীবাড়ী গ্রাম থেকে আসা রিপন জানান, আমি আমার মামার বিয়ের দাওয়াত খেতে এসেছি। বিয়ের একদিন আগে গায়ে হলুদ দেওয়া হয়। গায়ে হলুদের দিন বরকে যখন গায়ে হলুদ দেয় তখন স্থানীয় নারীরা বিভিন্ন ঢংয়ের এর বিয়ের গীত গায়। এবং পরের দিন বিদায় নিয়ে আসার পর বর পক্ষের বাড়িতে সকালবেলা আবারো শুরু হয় বিয়ের গীত। বিয়ের গীত শেষে দুপুর বেলায় শুরু হয় রং মাখামাখি সহ বিভিন্ন ধরনের খেলা।
ঠাকুরগাঁও থেকে আসা বর দানেশ বর্মন জানান, কনেকে বরের বাড়িতে নিয়ে আসার পর শুরু হয় বিয়ের গীত। চলে বৌভাতের দিন দুপুর পর্যন্ত এবং বর ও কনেকে একসাথে এক চাদরে বেঁধে বিভিন্ন ধরনের খেলা খেলে এবং কনেকে দিয়ে বিভিন্ন ধরনের কাজ করান। গোয়াল ঘরের গোবর ফেলা, জমি বাড়ি থেকে মাটি আনা, সবজি ক্ষেত থেকে শাকসবজি টেনে আনা পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের নতুন খেলা কনেকে নিয়ে খেলে স্থানীয় নারীরা। মহিলারা পুরুষ সেজে বিভিন্ন ধরনের খেলায় অভিনয় করেন। এসব খেলার অভিনয় শেষে সবাই মিলে একসাথে ভাবি, দেবর, ভগ্নিপতি, দাদী, ভাই, বোন, স্বামী-স্ত্রী সহ অনেকে রং মাখামাখি খেলা খেলেন।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ৯০ বছরের বৃদ্ধ মলিন জানান, এক সময় গ্রাম অঞ্চলের ছেলে-মেয়েদের বিয়ে হত, তখন গ্রামের নারীরা বিয়ের আগের দিন থেকে বিয়ের পরের দিন পর্যন্ত বিয়ের গীত গাইত। এখন দিন আধুনিক হওয়ার কারণে এইসব বিয়ের গীত ও রং খেলা হারিয়ে যেতে বসেছে। নিত্য নতুন আধুনিক হওয়ার কারণে সমাজ পরিবর্তন হওয়ার কারণে মানুষ এখন বিয়ের অনুষ্ঠান ভিডিও ধারণ করে রাখেন । তবে আমাদের সমাজে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিয়ের গীত কি জিনিস এই সম্পর্কে তাদের ধারণা থাকবে না। তারা শুধু বাবা, মা, দাদা, দাদীর কাছে গল্প শুনে জানবে বিয়ের গীতের এর কথা।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার নির্বাহী অফিসার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, আমি শুনেছিলাম গ্রাম অঞ্চলে এক সময় এইসব 'বিয়ের গীত' এর প্রচলন ছিল। এখনো রয়েছে কিছু কিছু জেলা বা গ্রাম অঞ্চলে। কালের পরিবর্তনে আধুনিকতার কারণেই এখন তা হারিয়ে যেতে বসেছে এইসব 'বিয়ের গীত'।