জয়ন্ত
রায়, বোচাগঞ্জ (দিনাজপুর): টেরাকোটা অলঙ্করণের বৈচিত্র্য
ইন্দো-পারস্য-ভাস্কর কৌশল ও শিল্প মহিমায় বিস্ময় জাগানিয়া কান্তজিউ
মন্দিরকে ঘিরে পর্যটন এলাকা গড়ে তুলতে প্রায় ৪৬ কোটি টাকা ব্যয় সাপেক্ষে
বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ কাজ ইতোমধ্যে শেষ করা হয়েছে।
দিনাজপুর জেলা শহর
থেকে মন্দিরে যাওয়ার জন্য ঢেপা নদীর উপর তৈরি হয়েছে ব্রীজ। যদি ওই
ব্রীজটি নির্মাণ না করা হতো তাহলে প্রায় ১০-১১ কিলোমিটার রাস্তা ঘুরে
কান্তজি মন্দিরটি এক নজর দেখার জন্য দর্শনার্থীদের যেতে হতো। দর্শনার্থী বা
পর্যটকরা এসে সেখানে থাকার কোন পরিবেশ ছিল না পূর্বে। সে কারণে মন্দিরের
পাশ্বেই নির্মাণ করা হয়েছে পর্যটন মোটেলের রেষ্ট হাউজ। দর্শনার্থীদের
ইতিহাস-ঐতিহ্য জানাতে নির্মাণ করা হয়েছে মিউজিয়াম। কেনা-কাটার সুবিধার্থে
পাশ্বেই রকমারী মার্কেট তৈরি করে এর আশপাশ্বের রাস্তা উন্নয়ন করা হয়েছে
ব্যাপক হারে। শুধু তাই নয়, পার্শ্ববর্তী শিব মন্দির ও রাজবেদী সংস্কার করে
আমুল পরিবর্তন ও আনা হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য বাবু মনোরঞ্জন শীল
গোপালের নিবিড় তত্ত্বাবধানে ওই সব সংস্কার ও উন্নয়ন করা সম্ভব হয়েছে বলে
এলাকাবাসী জানিয়েছেন। দিনাজপুর জেলা শহর হতে প্রায় ২০-২১ কিঃ মিঃ উত্তরে
এবং কাহারোল উপজেলা সদর হতে ৭ কিঃ মিঃ পূর্বে সুন্দরপুর ইউনিয়নে
দিনাজপুর-পঞ্চগড় মহাসড়কের পশ্চিমে ঢেপা নদীর তীরে প্রাচীণ টেরাকোটার
অনন্য নিদর্শন কান্তজিউ মন্দির অবস্থিত।
জানা
গেছে, কালিয়াকান্ত জিউ অর্থাৎ শ্রী-কৃষ্ণের বিগ্রহ অধিষ্ঠানের জন্য এই
মন্দির নির্মিত। এই জন্য এর নাম কান্তজিউ মন্দির। মন্দিরটি যে স্থানে
স্থাপিত তার নাম কান্তনগর। কান্তনগর সম্পর্কে পৌরাণিক বহু গল্প ও উপাখ্যান
প্রচলিত রয়েছে। কথিত রয়েছে, মহাভারতে বর্ণিত বিরাট রাজার গো-শালা ছিল
এখানে। প্রকৃতপক্ষে মন্দিরটি যেখানে তৈরী হয়েছে সেটি একটি প্রাচীন স্থান
এবং প্রাচীন দেওয়ালঘেরা দুর্গ নগরীরই একটি অংশ। প্রায় ১ মিটার (৩ ফুট)
উঁচু এবং প্রায় ১৮ মিটার (৬০ ফুট) বাহুবিশিষ্ট প্রস্তরনির্মিত একটি
বর্গাকার বেদীর উপর এই মন্দির নির্মিত।
শোনা
যায়, বেদীর পাথরগুলো আনা হয়েছিল প্রাচীন বানগড় (কোটিবর্ষ দেবকোট) নগরের
ভেঙ্গে যাওয়া প্রাচীন মন্দিরগুলো হতে। পাথরের ভিত্তি বেদীর উপর মন্দিরটি
ইটের তৈরী। বর্গাকারে নির্মিত মন্দিরের প্রত্যেক বাহুর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬
মিটার (৫২ ফুট)। মন্দিরের চারিদিকে রয়েছে বারান্দা। প্রত্যেক বারান্দার
সামনে রয়েছে ২টি করে স্তম্ভ। স্তম্ভগুলো বিরাট আকারের এবং ইটের তৈরী।
স্তম্ভ ও পাশের দেওয়ালের সাহায্যে প্রত্যেকটি দিকে ৩টি করে বিরাট খোলা
দরজা তৈরী করা হয়েছে। বারান্দার পরেই রয়েছে মন্দিরের কামরাগুলো। একটি
প্রধান কামরার চারিদিকে রয়েছে বেশ কয়েকটি ছোট কামরা। ৩ তলা বিশিষ্ট এই
মন্দিরের নয়টি চূড়া বা রত্ন ছিল। এজন্য এটিকে নবরত্ন মন্দির বলা হয়ে
থাকে।
১৮৯৭ খৃষ্টাব্দে ভূমিকম্পে মন্দিরের চূড়াগুলো ভেঙে গেছে। মন্দিরের
উচ্চতা ৭০ ফুট। মন্দিরের উত্তর দিকের ভিত্তিবেদীর শিলালিপি হতে জানা যায়, দিনাজপুরের জমিদার মহারাজা প্রাণনাথ রায় (মৃত্যু ১৭২২ খৃঃ) তার শেষজীবনে
মন্দির তৈরীর কাজ শুরু করেন এবং তার মৃত্যুর পর তার আদেশ অনুসারে দত্তক
পুত্র মহারাজা রামনাথ রায় এই মন্দির তৈরীর কাজ শেষ করেন ১৭৫২ খৃষ্টাব্দে।
ইট দ্বারা তৈরী এই মন্দিরের গায়ে পোড়ামাটির চিত্রফলকের সাহায্যে
রামায়ণ-মহাভারতের প্রায় সব কয়টি প্রধান কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। সে
সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের বিভিন্ন কাহিনী এবং সম্রাট আকবরের কিছু চিত্র কর্ম
রয়েছে। অতি সুন্দর ও কারুকার্যময় এই কান্তজীর মন্দির। পোড়া মাটির চিত্র
ফলকের এমন সুন্দর ও ব্যাপক কাজ বাংলার আর কোন মন্দিরেই নেই। সারা উপ
মহাদেশেও আছে কিনা সন্দেহ।
ঐতিহাসিক বুকানন হ্যামিলটনের মতে, এটি
বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দরতম মন্দির। কান্তজিউ বা শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহ ৯মাস
এই মন্দিরে অবস্থান করে এবং রাস পূর্ণিমায় ১মাস ব্যাপী তীর্থ মেলা বসে।
দেশ-বিদেশ হতে বহু পূণ্যার্থী আসেন এই মেলায় ও মন্দিরটি দেখতে। কান্তজিউ
মন্দিরে প্রতিদিন চলে পুজা অর্চনা। মন্দিরের সাথে রয়েছে তমাল বৃক্ষ। এই
বৃক্ষে সুতা বেধে বিশেষ করে নারীরা বিভিন্ন প্রকার মানত করে থাকে। প্রচলিত
রয়েছে মানত করলে তা পুরণ হয়।
বৃহত্তর
দিনাজপুর তথা উত্তরবঙ্গের জন্য এই সংস্কার কাজ অপার সম্ভাবনার দ্বার খুলে
দিবে বলে আমার বিশ্বাস। এলাকার সংসদ সদস্য বাবু মনোরঞ্জন শীল গোপালের
ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এ পর্যটন নগরী গড়ে তোলা হয়েছে।
কাহারোল
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মনিরুল হাসান জানান, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আওতায়
কান্তজিউ মন্দির, নয়াবাদ মসজিদ সংস্কার ও এর আশপাশ্বের স্থাপনা নির্মাণ
নিঃসন্দেহে পর্যটন নগরীকে সমৃদ্ধ করেছে। এটি এলাকার মানুষের জীবন মান
উন্নয়নে সহায়ক হবে।
এলাবাসীর
জানায়, মন্দিরে আসা দর্শনার্থী ও পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা দিতে
মন্দিরের পাশ্বে পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের জোর দাবি তুলেছেন।