এ, কে আজাদ: ঠাকুরগাঁওয়ে কোরবানির পশুরহাটগুলো জমে উঠেছে। প্রতিটি হাট বাজারে প্রচুর পরিমাণে গরু আমদানি হচ্ছে। বিক্রিও বেশ জমে উঠেছে। এখন পর্যন্ত ভারতীয় গরু দেখা না গেলেও বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয়েই গরু কেনাবেচায় খুশি নন। ক্রেতাদের অভিযোগ- দাম বেশি আর বিক্রেতাদের অভিযোগ তেমন দাম মিলছে না। আশানুরুপ দাম না পেয়ে নাখোশ বড় আকারের গরুর মালিকরা। পশুর হাটে ইজারাদার ও পুলিশ প্রশাসন নিরাপত্তায় কাজ করছে।
রবিবার (৯ জুন) ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীসংকৈল উপজেলার নেকমরদ হাট ও শনিবার কাতির হাট,গত শুক্রবার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার লাহিড়ী পশুরহাট এবং গত মঙ্গলবার হরিপুরের যাদুরাণী হাট ঘুরে বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে এমন তথ্য মিলেছে। তারা বলছেন, এবার প্রতিটি খামারেই অনেক গরু রয়েছে। তাদের ধারণা চাহিদার চেয়ে এবার গরু বেশি। তাই এখনো বাজার না জমলেও এবার বিক্রি কম হবে। তবে ঈদের সপ্তাহ আগে বাজারে ক্রেতার দেখা মিলবে।
একাধিক পাইকার জানান, এবার তাদের খামারে যে পরিমাণ গরু আছে তাতে সঙ্কট হবে না। তবে খাদ্যের দাম বাড়াতে গরু লালন পালনে খরচ বেড়েছে। এতে গত বছরের চেয়ে এবার পশুর দাম তুলনামূলক বেশি হবে। এ পর্যন্ত বাজারে যে পরিমাণ ক্রেতা তা গত বছরের চেয়ে কম। এতে মনে হয় এবার বাজারে প্রত্যাশিত ক্রেতা নাও মিলতে পারে।
শুক্রবার লাহিড়ী বাজার ঘুরে দেখা যায় বিক্রেতারা গরু বিক্রি করতে ব্যাস্ত সময় পার করছেন। কোনবানির পশুও তুলনামূলক আগের চেয়ে অনেক বেশী। সারিবন্ধভাবে রাখা কোরবানির পশুগুলোও সাড়িবদ্ধ ভাবে দাড়িয়ে রেখেছেন। তবে হাটে খুব বড় আকারের গরু দেখা যায়নি।
গরুর চাহিদার বিষয়ে বিক্রেতারা জানান, এখনো তেমন দরদাম না হলেও যারা আসছেন তাদের মধ্যে ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা বেশি। বড় গরুর বিষয়ে তাদের ভাষ্য- প্রতি বছরই এমনটা হয়। ছোট ও মাঝারি গরু বেশি বিক্রি হলেও বড় গরুর চাহিদা কম থাকে। এবারো বাজার ছোট ও মাঝাড়ী গরুর চাহিদা বেশী। আর দামের বিষয়ে তাদের ভাষ্য, এবার মিনিমাম দাম ৬০ হাজার হতে লাখ টাকা। তবে আকার ভেদে দাম কমবেশি হয়।
জেলার ৫ টি উপজেলায় ৮ টি পশুর হাটে গরু ছাড়াও এই অস্থায়ী পুশর হাটে খাসি, ছাগল ও সামান্য সংখ্যক ভেড়া রয়েছে। এগুলোর দাম জানতে চাইলে বিক্রেতারা বলেন, 'দাম এখন চেয়ে কী লাভ। ক্রেতা তো নেই। বাজার বুঝে দাম নির্ধাণ করব।'
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা জানান, এ বছর অস্বাভাবিকভাবে খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় বেশি দামে গরু ছাগল বিক্রি করা যাবে কিনা সংশয়ে আছেন খামার ব্যবসায়ীরা। তাদের ভাষ্য, এ বছর খাবারের দাম গতবারের তুলনায় তিন গুণ বাড়লেও সে হিসাবে গরুর দাম বাড়েনি। এতে প্রত্যাশিত দামে গরু বিক্রি করতে না পারলে খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। দাম নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে বিক্রেতারা জানান, তাদের মধ্যে অনেকেই ব্যাংক থেকে ঋণ ও ধারদেনা করে খামারে গরু লালন করেছেন। ফলে কাক্সিক্ষত দামে বিক্রি করতে না পারলে ঋণের বোঝা বইতে হবে।
একজন পাইকার জানান, গত বছরে যে গরুর দাম ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা ছিল এ বছর সেই গরু এক লাখের ওপরে তারা দাম হাঁকছেন। এভাবে গরুর আকার অনুযায়ী দামেও তফাৎ রয়েছে। এখন ক্রেতা কী পরিমাণ হবেন তা নিয়ে এখন তাদের দুশ্চিন্তা।
এ দিকে এ বছর ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানির পশুর বিশাল চাহিদা মেটাতে দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে গবাদিপশু রয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদফতর। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশে ১ কোটি ১০ লাখ কোরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে। এই চাহিদার তুলনায় দেশে এখন বাড়তি প্রায় ৮ লাখ পশু অর্থাৎ দেশে এখন প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ ৮৮ হাজার ৫৬৩টি পশু প্রস্তুত আছে।
অধিদফতরের একজন কর্মকর্তার ভাষ্য, পশুর জোগান বেশি থাকায় এবার ঈদে গবাদিপশু পালনকারী খামারি ও ক্রেতা উভয়ের জন্যই একটি ভালো পরিবেশ বজায় থাকবে। এ ছাড়া ভারত থেকে গবাদিপশু আসা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
ঠাকুরগাঁও জেলার ৫ টি উপজেলার প্রতি ৩০ টি পশুর হাট রয়েছে। এর মধ্যে বালিয়াডাঙ্গী, রাণীসংকৈল, হরিপুর ও পীরগঞ্জসহ ৪টি উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এবার ভারত থেকে দেশে পশু আসার হার অনেক কম। তবে দাম কম হওয়ার কারণে মিয়ানমার থেকে অনেক পশু দেশে ঢুকছে। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক সাংবাদিকদের বলেন, গেল ঈদুল আজহায় ৩৮ লাখ গরুসহ প্রায় ১ কোটি ৪ লাখ পশু কোরবানি দেয়া হয়েছিলো। এবছর ঈদে ৪২ লাখ গরুসহ প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ পশু কোরবানি করা হতে পারে। অর্থাৎ কোরবানির পশুর চাহিদা এবার ৫ শতাংশ বাড়তে পারে। এবারের ঈদুল আজহায় চাহিদার চেয়ে ৭ লাখেরও বেশি পশু প্রস্তুত রয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদফতর বলছে, এ বছর ৪৫ লাখ ৮২ হাজার গরু ও মহিষ এবং ৭২ লাখ ৬ হাজার ৫৬৩টি ছাগল, ভেড়া ও অন্যান্য গবাদিপশু প্রস্তুত রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, গবাদিপশুর মজুদ গত বছর ভাল ছিল। গত বছর গবাদিপশু উদ্বৃত্ত ছিল ১০ লাখ। আর প্রায় ১০ লাখ প্রতিবেশী দেশ থেকে আনা হয়েছিল।
অন্য দিকে ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে বিগত কয়েক বছরের তুলনায় চলতি বছরে ঠাকুরগাঁওয়ের ৪ টি উপজেলার সীমান্ত এলাকা দিয়ে বৈধ ও অবৈধ পথে ভারত থেকে গরু-মহিষ কম আসছে। এতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন ঠাকুরগাঁও জেলার খামারিরা। অবৈধ পথে ভারত থেকে আসা গরু-মহিষের সঠিক হিসাব না থাকলেও বৈধ পথে আসা পশুর একটি হিসাব রয়েছে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার হরিণমারী কাস্টমস করিডোরে।
কোরবানির ঈদ উপলেক্ষে ঠাকুরগাঁওয়ের পাঁচটি উপজেলায় নিয়মিত ও মৌসুমীসহ প্রায় ৩০ টি হাটে প্রচুর পরিমাণে দেশি-বিদেশি, ছোট-বড় গরু-ছাগল আমদানী ও বেচা-কেনা হচ্ছে। বছরব্যাপী গরু পালনকারী খামারীরা এ সময় এসব হাটে প্রচুর পরিমাণে কোরবানির গরু বিক্রি করে। ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিরা কোরবানির জন্য শেষমূহুর্তে পচ্ছন্দের গরু-ছাগল ক্রয় করতে হাট-বাজারগুলোতে ভিড় করছেন। ঈদের কয়েকটা দিন বাকি থাকায় চট্রগ্রাম ও ঢাকাসহ বাইরের পাইকারেরা হাট-বাজারে ভিড় করলেও গো-খাদ্যের দাম ও গাড়ি ভাড়া গুণ হওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী গরুর দাম বেশি পড়ায় লোকশানের আশংকা ব্যাপারী বা পাইকারদের।
প্রতিহাটে দালাল ও ফড়িয়া মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে খামারীদের কাছ থেকে সরাসরি গরু-ছাগল পাওয়া যায় না। তাদের কারণে গরুর-ছাগলের দাম বেশি হাঁকা হচ্ছে বলে জানান ক্রেতারারা। তবে বিক্রেতাদের অভিযোগ খড়, ভুষিসহ বিভিন্ন গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। সারা বছর একটি গরু পালন করতে যে ব্যয় হয় সে তুলনায় গরুর দাম পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান বিক্রেতা বা খামারীরা।
এছাড়াও জেলার সীমান্তবর্তী বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বড়বাড়ী গ্রামের মোজাম্মেল হকের বিগবস নামে খ্যাত সবচেয়ে দর্শনীয় গরু দেখার জন্য দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেই আছে প্রতিদিন। গরুটির ওজন প্রায় ১ হাজার কেজি এবং দাম হাকা হয়েছে ১০ লাখ টাকা। তবে ভারত থেকে এবার এখন পর্যন্ত গরু না আসায় এবং পাইকারদের আনা-গোনা কম বলে জানান বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার লাহিড়ী হাট কমিটির দায়িত্ব প্রাপ্ত সদস্যরা।